গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে এ্যালজির উৎপাদন ও ব্যবহার
গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে এ্যালজির উৎপাদন
এ্যালজি এক ধরনের উদ্ভিদ যা আকারে এককোষী থেকে বহুকোষী বিশাল বৃক্ষের মত হতে পারে। তবে আমরা এখানে দুটি বিশেষ প্রজাতির এককোষী এ্যালজি ক্লোরেলা ও সিনেডেসমাস নিয়ে আলোচনা করবো যা গো- খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। এরা সূর্যালোক, পানিতে দ্রবিভূত অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জৈব নাইট্রোজেন আহরন করে সালোক সংশে−ষন প্রক্রিয়ায় বেঁচে থাকে। এরা অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল বিশেষ করে বাংলাদেশের মত উষ্ণ জলবায়ুতে।
এ্যালজির পুষ্টিমানঃ বিভিন্ন ধরনের অপ্রচলিত খাদ্যের মধ্যে এ্যালজি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পুষ্টিকর খাদ্য যা বিভিন্ন ধরনের আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন- খৈল, শুটকি মাছের গুঁড়া ইত্যাদির বিকল্প হিসাবে ব্যবহার হতে পারে। শুষ্ক এ্যালজিতে শতকরা ৫০ - ৭০ ভাগ আমিষ বা প্রোটিন থাকে, ২০ - ২২ ভাগ চর্বি এবং ৮ - ২৬ ভাগ শর্করা থাকে। এছাড়াও এ্যালজিতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন বি থাকে। কেবল মাত্র ”সিসটিন” ছাড়া এ্যালজির প্রোটিনে বিভিন্ন ধরনের এ্যামাইনো এসিডের অনুপাত প্রায় ডিমের প্রোটিনের সমান। রোমন্থনকারী প্রাণীতে ( যেমন গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া) এ্যালজির প্রোটিনের পাচ্যতা ৭৩%।
এ্যালজির উৎপাদন পদ্ধতি ও সংক্ষেপে বর্ণনা করা
এ্যালজি চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণঃ এ্যালজির বীজ, কৃত্রিম অগভীর পুকুর, টিউবয়েলের পরিস্কার পানি, মাসকালই বা অন্যান্য ডালের ভূষি এবং ইউরিয়া।
১। প্রথমে সমতল, ছায়াযুক্ত জায়গায় একটি কৃত্রিম পুকুর তৈরী করতে হবে। পুকুরটি লম্বায় ১০ ফুট, চওড়ায় ৪ ফুট এবং গভীরতায় ১/২ ফুট হতে পারে। পুকুরের পাড় ইট বা মাটির তৈরী হতে পারে। এবার ১১ ফুট লম্বা, ৫ ফুট চওড়া একটি স্বচ্ছ পলিথিন বিছিয়ে কৃত্রিম পুকুরের তলা ও পাড় ঢেকে দিতে হবে। তবে পুকুরের আয়তন প্রয়োজন অনুসারে ছোট বা বড় হতে পারে। তাছাড়া মাটির বা সিমেন্টের চাড়িতেও এ্যালজি চাষ করা যায়।
২। ১০০ গ্রাম মাসকলই ( বা অন্য ডালের) ভূষিকে ১ লিটার পানিতে সারারাত ভিজিয়ে কাপড় দিয়ে ছেঁকে পানিটুকু সংগ্রহ করতে হবে। একই ভূষিকে অন্তত তিনবার ব্যবহার করা যায়, যা পরবর্তীতে গরুকে খাওয়ানো যায়।
৩। এবার কৃত্রিম পুকুরে ২০০ লিটার পরিমাণ কলের পরিস্কার পানি, ১৫ - ২০ লিটার পরিমান এ্যালজির বীজ, যা এ্যালজির ঘনত্বের উপর নির্ভর করে এবং মাসকলাই ভূষি ভেজানো পানি নিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর ২- ৩ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া নিয়ে উক্ত পুকুরের পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
৩। এরপর প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও বিকেলে কমপক্ষে তিনবার এ্যালজির কালচারকে নেড়ে দিতে হবে। পানির পরিমাণ কমে গেলে নতুন করে পরিমাণ মত পরিস্কার পানি যোগ করতে হয়। প্রতি ৩/৪ দিন পর পর পুকুর প্রতি ১ - ২ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া ছিটালে ফলন ভালো হয়।
৪। এভাবে উৎপাদনের ১২ - ১৫ দিনের মধ্যে এ্যালজির পানি গরুকে খাওয়ানোর উপযুক্ত হয়। এ সময় এ্যালজির পানির রং গাঢ় সবুজ বর্ণের হয়। এ্যালজির পানিকে পুকুর থেকে সংগ্রহ করে সরাসরি গরুকে খাওয়ানো যায়।
৫। একটি পুকুরের এ্যালজির পানি খাওয়ানোর পর উক্ত পুকুরে আগের নিয়ম অনুযায়ী পরিমাণ মত পানি, সার, এবং মাসকলাই ভূষি ভেজানো পানি দিয়ে নতুন করে এ্যালজি কালচার শুরু করা যায়, এ সময় নতুন করে এ্যালজি বীজ দিতে হয় না।
৬। যখন এ্যালজি পুকুরে পানির রং স্বাভাবিক গাঢ় সবুজ রং থেকে বাদামী রং হয়ে যায় তখন বুঝতে হবে যে উক্ত কালচারটি কোন কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে নতুন করে কালচার শুরু করতে হবে। এ কারণে এ্যালজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ।
সাবধনতা
১। এ্যালজির পুকুরটি সরাসরি সূর্যালোকের নিচে না করে ছায়াযুক্ত স্থানে করা উচিৎ। কারণ অতি আলোকে এ্যালজি কোষের মৃত্যু হয়। এ জন্য কালচারটি নষ্ট হয়ে যায়।
২। কখনোই মাসকলাই ভূষি ভেজানো পানি বর্ণিত পরিমানের চেয়ে বেশী দেয়া উচিৎ নয়, এতেও ”নিউট্রেন্ট সুপার সেচুরেশন” এর কারণে এ্যালজি কোষ মারা যেতে পারে।
৩। এ্যালজি পুকুরের পানিকে নাড়া না দিলে কোষের উপর কোষ থিতিয়ে কালচারটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৪। যদি কখনো এ্যালজি পুকুরের পানি গাঢ় সবুজ রংয়ের পরিবর্তে হালকা নীল রং ধারন করে তখন তা ফেলে দিয়ে নতুন করে কালচার শুরু করতে হবে। কারণ নীলবর্নের এ্যালজি ভিন্ন প্রজাতির বিষাক্ত এ্যালজি যা ক্লোরেলা ও সিনেডেসমাস থেকে ভিন্ন।
গরুকে এ্যালজি খাওয়ানোঃ এ্যালজির পানি সব ধরনের এবং সব বয়সের গরুকে অর্থাৎ বাছুর, বাড়ন্ত গরু, দুধের বা গর্ভবতী গাভী, হালের বলদ সবাইকেই খাওয়ানো যায়। এ্যালজি খাওয়ানোর কোন ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। এটাকে সাধারণ পানির পরিবর্তে সরাসরি খাওয়ানো যায়। এক্ষেত্রে গরুকে আলাদা করে পানি খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। দানাদার খাদ্য অথবা খড়ের সাথে মিশিয়েও খাওয়ানো যায়। সাধারণত দুই এক দিনের মধ্যেই গরু এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। গরু সাধারণত ঃ তার ওজনের ৮ ভাগ অর্থাৎ ১৫০ কেজি ওজনের গরু ১২ কেজি পরিমান এ্যালজির পানি পান করে। তবে গরমের দিনে এর পরিমাণ বাড়তে পারে। এ্যালজির পানিকে গরম করে খাওয়ানো উচিৎ নয়, এতে এ্যালজির খাদ্যমান নষ্ট হতে পারে। যদি বেশী গরু থাকে, ( যেমন ধরুন ৫টি গরু আছে)। এক্ষেত্রে অন্ততঃ পূর্বে বর্ণিত আকারের ৫টি কৃত্রিম পুকুরে এ্যালজি চাষ করা উচিৎ যাতে একটির এ্যালজির পানি শেষ হতে পরবর্তীটি খাওয়ানোর উপযুক্ত হয়।
এ্যালজি খাওয়ানোর উপকারীতাঃ রোমন্থনকারী প্রাণী যেমন গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া যে ঘাস বা খড় ইত্যাদি খেয়ে থাকে তা পাকস্থলীর জীবাণু দ্বারা ভেঙ্গে হজম হয়। এই জীবাণুর পরিমাণ এবং কার্যক্রম খাদ্যের উপর নির্ভর করে। যদি ভাল মানের খাদ্য অর্থাৎ পরিমাণ মত প্রোটিন, সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন এবং খনিজ যুক্ত খাবার খায় তা হলে এই জীবাণুর পরিমাণ ও কার্যক্রম বেড়ে যায় তথা গরুতে প্রোটিন এবং বিপাকীয় শক্তি সরবরাহ বেড়ে যায়। আবার যদি নিম্নমানের খাদ্য যেমন- খড় খায় তবে গরু তার চাহিদা মত বিপাকীয় শক্তি ও প্রোটিন পায় না। তাই শুধু খড় খাওয়ালে গরুর উৎপাদন কমে যায়। খড়ের সাথে সাধারণ পানির পরিবর্তে এ্যালজির পানি খাওয়ালে বাড়ন্ত গরুর মাইক্রোবিয়াল প্রোটিন সরবরাহ বেড়ে যায় এবং গরুর দৈহিক ওজন হ্রাস অনেক কমে যায়। আমাদের দেশে প্রায় সারা বছরই কাঁচা ঘাসের অভাব প্রকট। বিশেষ করে শহর এলাকায় এ সমস্যা তীব্রতর। এর ফলে গরুর ভিটামিন এবং খনিজের অভাব জনিত রোগ যেমন- অন্ধত্ব, রাতকানা,গাভীর অনুর্বরতা ইত্যাদি দেখা যায়। যেহেতু এ্যালজিতে প্রচুর পরিমানে বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ থাকে, তাই এ্যালজি খাওয়ানোর ফলে গরুকে এসব পুষ্টির অভাব জনিত রোগ থেকে রক্ষা করা যায়। আমাদের দেশে গরুর প্রধান খাদ্য খড়। তাছাড়া প্রোটিন এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের অপ্রতুলতা এবং দুর্মূল্যের কারণে সবাই এ সব খাদ্য গরুকে খাওয়াতে পারে না। ফলশ্র“তিতে গরুর উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় এ্যালজির পানি ব্যাবহার করে অধিক পরিমাণ গরুর মাংস এবং দুধ উৎপাদন সম্ভব, যা দারিদ্র বিমোচন এবং আতœকর্মসংস্থানে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও এ্যালজি বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে, প্রতি গ্রাম এ্যালজি প্রায় ১.৬ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করে। এভাবে এ্যালজি উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাও সম্ভব।
No comments
Please validate the capture