গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে কলাগাছ সংরক্ষণ
কলাগাছ সংরক্ষণ
বাংলাদেশে প্রতি বছর কলা সংগ্রহের পর প্রায় ২৪ লক্ষ মেট্রিক টন কলাগাছ পাওয়া গেলেও এর খুব নগন্য অংশই গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহার হয়। সারা বছরের মধ্যে বর্ষা মৌসুমেই কলা উৎপাদনের পরিমাণ বেশী। উৎপন্ন কলা গাছ বৃষ্টির কারণে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। গো-খাদ্য হিসেবে এর উপযোগীতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক।
কলাগাছ খাদ্য হিসাবে দু’ভাবে ব্যবহার করা যায়
(ক) সাইলেজ প্রক্রিয়ায়
(খ) সরাসরি মিশ্র খাদ্য হিসাবে ব্যবহার।
১. সাইলেজ প্রক্রিয়ায় ব্যবহারঃ এ পদ্ধতিতে কলাগাছে শুকনো খড় ব্যবহার করে অথবা না করেও সাইলেজ তৈরী করা যায়। সাইলেজ তৈরীর প্রয়োজনীয় উপকরন গুলো হলো - উঁচু জায়গায় মাটির গর্ত, খড়কুটা, পলিথিন, চিটাগুড়, পানি এবং টুকরো কলাগাছ।
শুকনো খড় ব্যবহার না করে কলাগাছ সংরক্ষণঃ কলাগাছ সংরক্ষণ মাটির গর্ত অথবা পাকা সাইলোতে করা যায়। তবে পাকা সাইলো খুব ব্যয়বহুল। এ জন্য উঁচু জায়গায় লম্বালম্বি মাটির গর্ত খুঁড়ে কলাগাছ সংরক্ষণ করা যায়। মাটির গর্তটির উপরিভাগের প্রশস্থে ৩.১ মিটার, মাঝামাঝি গভীরতায় ২.৫ মিটার এবং তলায় ১.৫ মিটার হবে। এর ফলে গর্তটি কোনাকৃতি না হয়ে পাতিলের তলার ন্যায় বাঁকানো হবে। গর্তটির গভীরতা ৯২ সেন্টিমিটার হবে। দৈর্ঘ্য নির্ভর করবে কলাগাছের পরিমাণের উপর। কলা সংগ্রহ করার পর কলাগাছ চপার মেশিন বা কাস্তে দ্বারা ছোট ছোট ( দৈর্ঘ্য ২-৩ সে.মি.) করে কাটতে হবে। তারপর উক্ত গর্তে টুকরো টুকরো কলাগাছ স্তরে স্তরে সাজাতে হবে। পানির সাথে চিটাগুড়ের ১ঃ১ অনুপাতের দ্রবণ সমভাবে ছিটিয়ে ভালভাবে মিশাতে হবে। প্রতি ১০০ কিলো কলাগাছের সাথে ২.০-২.৫ কিলো চিটাগুড় দ্রবণ মিশাতে হবে। চিটাগুড়ের দ্রবণটি আস্তে আস্তে ঝরনা বা হাত দিয়ে বিছানো কলাগাছের উপর ছিটিয়ে দিতে হবে। একশ ঘনফুট একটি মাটির গর্তে ৮.০-১০.০ মেট্রিক টন কলাগাছ সংরক্ষণ করা যায়। গর্তটি অবশ্যই উঁচু জায়গায় হতে হবে। গর্তে তলায় ও চারিদিকে পুরু করে শুকনো খড় বা পলিথিন বিছাতে হবে। পরতে পরতে চিটাগুড় মিশ্রিত কলাগাছ গর্তে সাজাতে হবে এবং পা দিয়ে চেপে ভিতরের বাতাস যথা সম্ভব বের করে দিতে হবে। যত এঁটে সাজানো যাবে তত ভাল সাইলেজ হবে। এভাবে ভর্তি করে মাটির উপরে প্রায় ৯০-১২২ সে.মি. পর্যন্ত কলাগাছ সাজাতে হবে। সাজানো শেষ হলে খড় দ্বারা পুরু করে আস্তরন দিয়ে সুন্দর করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সবশেষে ৮-১০ সে.মি. পুরু করে মাটি দিতে হবে। সম্পূর্ণ কলাগাছ একদিনেই সাজানো যায়। তবে বৃষ্টি না থাকলে প্রতিদিন কিছু কছু করেও কয়েক দিনব্যাপী সাইলেজ তৈরী করা যায়। এভাবে উন্নত মানের কলাগাছের সাইলেজর বৈশিষ্ট্যাবলী ও কলাগাছের বিভিন্ন অংশের পুষ্টিমান যথাক্রমে সারণী ১৭.৬ ও ১৭.৭ এ দেয়া হল।
কলাগাছের সাইলেজ খাওয়ানোর পদ্ধতিঃ প্রতি একশত (১০০) কেজি কলাগাছের সাথে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া পরিস্কার জায়গায় মিশ্রণ প্রক্রিয়া শেষে গরুকে সরবরাহ করা যেতে পারে।
শুকনো খড় ব্যবহার করে সংরক্ষণঃ কলাগাছের সাইলেজে শুকনো খড় ব্যবহারের জন্য প্রতি ১০০ কেজি কলাগাছের স্তর সাজানো শেষ হলে এক স্তর শুকনো খড় (৫-১০ কিলো) উপরের নিয়মে ব্যবহার করতে হবে। পরতে পরতে কলাগাছ ও খড় সাজাতে হবে এবং পা দিয়ে মাটির গর্ত ভর্তি করে খড় দ্বারা পুরু করে আস্তরন দিয়ে সুন্দর করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সবশেষে ৮-১০ সে.মি. পুরু করে মাটি দিতে হবে। এখানে শুধু স্মরণ রাখতে হবে খড়ের স্তরে কোন প্রকার চিটাগুড় ছিটানোর প্রয়োজন নেই। উলে−খিত নিয়মে ৬ মাস পর্যন্ত কলাগাছ সংরক্ষণ করা যায়।তবে পানি ঢুকলে কলাগাছের সাইলেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সংমিশ্রিত কলাগাছ (কলাগাছ+চিটাগুড়) ও সাইলেজের (কলাগাছ+চিটাগুড়) পুষ্টিমান সারণী ১৭.৮ এ দেয়াহল।
খড় যুক্ত কলাগাছের সাইলেজ খাওয়ানোর পদ্ধতিঃ একশত (১০০) কেজি খড়যুক্ত কলাগাছের সাইলেজের সাথে ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া পরিষ্কার জায়গায় ভালভাবে মিশ্রণ প্রক্রিয়া শেষে গরুকে সরবরাহ করা যেতে পারে।
সরাসরি কলাগাছ খাওয়ানোর পদ্ধতি
১। কলা সংগ্রহের পর কলাগাছ চপার মেশিন বা কাস্তে দ্বারা ছোট ছোট করে কেটে পলিথিন বা পাকা মেঝেতে বিছাতে হবে।
২। প্রতি ১০০ কেজি কলা গাছের জন্য ২-২.৫ কেজি চিটাগুড় একটি পাত্রে মেপে নিয়ে ২-২.৫ কেজি পানি এবং ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ভালভবে মিশাতে হবে। চিটাগুড় ও ইউরিয়া মিশ্রিত দ্রবণ ঝরণা বা হাত দিয়ে কলাগাছের টুকরোয় ছিটিয়ে দিতে হবে যাতে করে ইউরিয়া ও চিটাগুড়ের দ্রবণটি কলাগাছের সাথে ভালভাবে মিশে যায়।
৩। উক্ত মিশ্রিত খাদ্যটি সরাসরি গরুকে যথেচ্ছা পরিমাণ খাওয়ানো যায়। কলাগাছের সাইলেজ ও সংমিশ্রিত কলাগাছ সরাসরিভাবে গরুকে খাওয়ানোর পর এদের গ্রহন মাত্রা ও পরিপাচ্যতা সরণী ১৭.৯ এ দেয়া হল ।
সুবিধাঃ
১। শ্রমিক খরচ, ইউরিয়া ও মোলাসেস ক্রয় ব্যতীত অন্য কোন খরচ নেই।
২। প্রতি ১০০ কেজি দৈহিক ওজনের একটি গরু প্রতিদিন ১৩ কেজি প্রক্রিয়াজাত কৃত কলাগাছ অথবা খড় মিশ্রিত সাইলেজের ৮ কেজি খেতে পারে, যার দ্বারা প্রাণির শরীরের রক্ষণাবেক্ষণ সহ দৈহিক ওজনও বৃদ্ধি পায়।
৩। যেহেতু ইউরিয়া ও চিটাগুড় কলাগাছের সাথে ধীরে ধীরে খাচ্ছে অতএব বিষক্রিয়া হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।
৪। কলা উৎপাদনের পাশাপাশি কলাগাছকে প্রক্রিয়াজাত করে গরুকে সরাসরি খাওয়ানো যায় অথবাপরবর্তী সময়ে খাওয়ানোর জন্য সাইলেজ করে রাখা যায়।
No comments
Please validate the capture