কি ভাবে গাভি পালন করবেন
গাভি পালন
নজস্ব পরিবেশে নিজ বাড়িতে ১-৫টি গাভী পালন করাকে পারিবারিকভাবে গাভী পালন বুঝায়। পরিবারের আকার, জীবনযাত্রার মান ও মূলধনের উপর গাভীর সংখ্যা নির্ভর করে। অনেকে অন্যের গাভী বর্গা নিয়ে পালন করে থাকে। গাভী পালন পরিবারের সচ্ছলতা ও আয় বৃদ্ধি করে ও পাশাপাশি দুধের চাহিদা মেটায়। গাভী পালনের জন্য পালনকারীকে গাভী পালনের বিবেচ্য বিষয়, বাসস্থান, খাদ্য, গোসল বা ব্রাশ করানো সহ সর্বাবস্থায় গাভীর পরিচর্যা সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। গাভী পালনের মাধ্যমে বেকার যুবকদের বেকারত্ব দূর হয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
গাভী পালনের বিবেচ্য বিষয়
গাভীর জাতঃ নিজস্ব পছন্দ, আবহাওয়া ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে গাভীর জাত নির্বাচন করতে হবে। এলাকার জনগণের চাহিদা ও বাজার দর বিবেচনা করতে হবে, সাধারণতঃ যে গাভী বেশি দুধ দেয় ও পরিবেশের সাথে উপযোগী তাদের পালন করতে হবে।
গাভী প্রতি উৎপাদন ক্ষমতাঃ প্রতিটি গাভীর নিজস্ব উৎপাদনের পরিমাণের একটি নিæতম সীমারেখা থাকা উচিত। কোন গাভীর উৎপাদনের ক্ষমতা সীমারেখার নিচে নেমে গেলে তাকে বাদ দিতে হবে। প্রতিটি গাভীর উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পালনকারীকে সজাগ দৃষ্টি রেখে কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে।
গাভীর সংখ্যাঃ পালনকারীর মূলধন, সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করেই গাভীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে হবে। এ সংখ্যা কোনভাবেই নির্দিষ্ট সংখ্যার কম বা বেশি হবে না। কারণ গাভীর সংখ্যা বাড়ালেই যে সংখ্যানুপাতে আয় বাড়বে তা ঠিক নয়।
গাভীর শারীরিক অবস্থাঃ গাভীর শারীরিক অবস্থার উপর উৎপাদন নির্ভর করে। গাভী পালনে অবশ্যই গাভীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করতে হবে।
গাভীর খাদ্যঃ খাদ্যের গুণগত মান, ধরন এবং পছন্দ-অপছন্দ ও কোন প্রকারের গাভীকে কখন কিভাবে কতটুকু খাদ্য দিতে হবে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। গাভীকে জীবনধারণ ও উৎপাদনের জন্য খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
খাদ্য সরবরাহঃ গাভী পালনে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা হল প্রধান সমস্যা। গাভীর জন্য কাঁচা ও শুকানো ঘাস, খড় ও বিচালী, ডাল জাতীয় শস্য, গম, ভুট্টা প্রভৃতি নিজস্ব খামারেই উৎপাদন করার ব্যবস্থা রাখা ভাল। দানাদার খাদ্য মৌসুমের সময় ক্রয় করে সংরক্ষণ করে রাখা ভাল।
নতুন গাভীর আমদানিঃ পালনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য ছাঁটাই করা গাভীর জায়গায় উন্নতমানের গাভী আমদানি করতে হবে। গাভীর নিজস্ব উৎপাদন কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যহানী, রোগাক্রান্ত গাভী ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত গাভী ছাঁটাই করতে হবে।
বিনিয়োগঃ গাভী পালনের জন্য ঘর-বাড়ী ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করা একান্ত প্রয়োজন। এগুলো ক্রয় করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, এর ফলে শ্রম খরচ ও সময় বাঁচবে কিনা, অনায়াসে কাজ করা সম্ভবপর কিনা, স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য দুধের গুণাগুণ বৃদ্ধি পাবে কিনা ইত্যাদি বিবেচনা করার পর বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে।
বাজার পরিস্থিতিঃ গাভী পালনে এলাকার লোকজনের চাহিদা, ক্রয় ক্ষমতা, বাজারজাতকরণের সুযোগসুবিধা বিবেচনা করা একান্ত প্রয়োজন। এছাড়া দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় মালামাল আনা-নেয়ার জন্য রাস্তা-ঘাট, যানবাহন আছে কিনা তাও দেখতে হবে।
ব্যবস্থাপনাঃ গাভী পালনে ২৪ ঘন্টার কখন কিভাবে গাভীকে খাওয়াতে হবে, ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে ও উৎপাদনের প্রতি কড়া নজর রাখতে হবে। প্রজনন বিধিসম্মত হচ্ছে কিনা, কি পদ্ধতিতে খামারকে রোগমুক্ত রাখা যায়, উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বিতরণ হচ্ছে কিনা, বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঠিকমত জমা হচ্ছে কিনা, পরিবেশ দূষণ মুক্ত থাকছে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখতে হবে।
দ্রব্যের উৎপাদনঃ গাভী পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল উৎকৃষ্ট মানের দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাংস ইত্যাদি উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ় করা। উৎকৃষ্টমানের দুধ পাওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হল দোহন কাজে নিয়োজিত গোয়ালা, ব্যবহারকৃত পাত্র ও যন্ত্রপাতি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা। দ্বিতীয় শর্ত দুধে জীবাণুর সংখ্যা হ্রাস করা। ৩য় শর্ত অপ্রীতিকর স্বাদ বা গন্ধমুক্ত হওয়া। ৪র্থ শর্ত রোগমুক্ত ও স্বাস্থ্যবান গাভী ও পরিচর্যাকারী। গাভীর ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুনাশক ঔষধ দিয়ে মাঝে মাঝে শোধন করতে হবে, যাতে কোন প্রকার মহামারী লাগতে না পারে। এদিকগুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় আনতে হবে।
নথিপত্রের ব্যবহারঃ গাভী পালনে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করার জন্য উপযুক্ত নথি রাখতে হবে। দৈনন্দিন নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণ করলে খামারের সঠিক চিত্র একনজরে দেখা যায় ও সেভাবে কাজ করা যায়। আয়-ব্যয় নির্ভর করে নথিপত্র বিবেচনা করে কাজ করার উপর।
গাভীর বংশবৃদ্ধিঃ সুস্থ, সবল ও দোষমুক্ত গাভী সাধারণতঃ প্রতি বছরই একটি করে বাচ্চা প্রসব করে। গাভীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে উৎপাদনক্ষম গাভী পালন করতে হবে ও লাভবান হওয়া যাবে।
শুরুর সময়ঃ কোন সময় থেকে গাভী পালন শুরু করলে বেশি লাভবান হওয়া যাবে ও গাভীকে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করা যাবে তা বিবেচনা করতে হবে।
মালিকের নৈপুণ্যঃ দক্ষতার সাথে কর্মচারী পরিচালনার উপরই সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে। গাভী পালন সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করার তিনটি মূলমন্ত্র- ১ম পালনের যাবতীয় কাজের একটি নিখুঁত খসড়া বানানো। ২য় বিভিন্ন শাখার কাজ কর্ম সঠিকভাবে বন্টন করা ও ৩য় ঠিকমত কাজ হচ্ছে কিনা তা দেখাশুনা করা এবং সময়মতো উপদেশ ও পরামর্শ দেওয়া।
No comments
Please validate the capture