বাছুরের স্বাস্থ্য বিধি, রোগ ব্যাধি ও প্রতিকার
বাছুরের স্বাস্থ্য বিধি, রোগ ব্যাধি ও প্রতিকার
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে Prevention is better than cure অর্থাৎ রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করাই বুদ্ধি মানের কাজ। বাছুরের স্বাস্থ্য রক্ষা ও রোগমুক্ত রাখার জন্য বিশেষ কয়েকটি নিয়মের প্রতি খেয়াল রাখলে ভবিষ্যতে অসুখ- বিসুখ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
১. জন্মের পরপরই বাছুরকে শালদুধ খাওয়াতে হবে। যেহেতু শালদুধ অধিক পরিমাণে ’এন্টিবডি’ দ্বারা গঠিত সেহেতু নবজাত বাছুরের জন্য ইহা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই শালদুধ খাওয়ালে বাছুরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
২. স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, পরিষ্কার সুষম খাদ্য, পরিষ্কার পানি, সেবা-যতœ ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য রাখা দরকার।
৩. বাছুর গুলোকে পৃথক পৃথক রাখা উচিত। সুস্থ্য বাছুরকে কোন অবস্থাতেই রোগাক্রান্ত প্রাণির সংস্পর্শে যেতে দেয়া যাবে না। এতে রোগ সংক্রমনের ভয় থাকে।
৪. বাছুরের শরীর নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত। শুকনো খড় দ্বারা তাদের শরীর ঘসে পরিষ্কার করে গোসল করানো প্রয়োজন।
৫. খাবার পাত্র ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত।
৬. কুকুর, বিড়াল, উকুন, আটালী, মশা-মাছি, পোকা-মাকড় এ সবের যেন উপদ্রব না থাকে তা খেয়াল রাখা উচিত।
৭. কোন রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া বা অসুস্থতা দেখা দেয়ার সাথে সাথে সেটাকে আলাদা করে ত্বরিত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও পরিচর্যা করা উচিত।
৮. রোগে কোন বাছুর মারা গেলে তা মাটিতে পুতে রাখা বা পুড়ে ফেলা উচিত।
৯. বছরে দুইবার অর্থাৎ বর্ষার প্রারম্ভে ও শরতের শেষে নির্দিষ্ট মাত্রায় কৃমি নাশক ঔষধ ব্যবহার করলে বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধি ভাল হয়।
১০. যে সব রোগের প্রতিষেধক টিকা আছে, সময়মত সে সব টিকা দেয়া।
বাছুরের রোগ ব্যাধিঃ জন্মের পর থেকেই বাছুরের নানাবিধ রোগ-ব্যাধি হতে পারে। বাছরের জন্য যে কোন রোগই মারাত্বক। কারণ বয়স্ক প্রাণির চেয়ে বাছুরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। আমাদের দেশে সাধারণতঃ বাছুরের যে সব রোগ হয়, সেগুলো হলো
ক) সংক্রামক রোগ
খ) কৃমি বা পরজীবীজনিত রোগ
গ) প্রোটজোয়াজনিত রোগ
ঘ) সাধারণ রোগ-ব্যাধি।
১। সংক্রামক রোগঃ বাছুরের নানা ধরনের সংক্রামক রোগ হয়ে থাকে, যার মধ্যে মারাত্মক রোগগুলো হলো১।সাদা বাহ্য বা কাফ স্কাওয়ার ২.নেভাল ইল বা নাভীর রোগ ৩. সালমোনেলোসি ৪. বাছুরের ডিপথেরিয়া ৫. নিউমোনিয়া ৬. বাদলা ৭. তড়কা ৮. গলাফুলা ৯. ধনুস্টংকার ১০.ক্ষুরারোগ ১১. জলাতংক ১২. গো-বসন্ত।
২। কৃমি বা পরজীবীজনিত রোগঃ পরজীবী অর্থ পরের উপর জীবনধারণকারী। বাছুরের উপর বিভিন্ন্ পরজীবী জীবনধারণ করে থাকে। যেগুলো বাছুরের কোন উপকার না করে ক্ষতিসাধন করে থাকে। পরজীবী সাধারনত দুই ধরনের হয় যেমনঃ-
১। দেহাভ্যন্তরের পরজীবী
২ বহিঃদেহের পরজীবী
দেহাভ্যন্তরের পরজীবীঃ এটি কৃমি। বাছুর খুব তাড়াতড়ি এ কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়। আমাদের দেশে বেশির ভাগ বাছুরই দেহাভ্যন্তরের পরজীবী অর্থাৎ কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। দেহাভ্যন্তরের পরজীবী সাধারনত তিন ধরনের হয়
১। গোল কৃমি
২। ফিতা কৃমি
৩। পাতা কৃমি
দেহাভ্যন্তরের পরজীবী বাছুরের অনেক ক্ষতি করে কেননা তারা শরীর হতে পুষ্টি গ্রহণ করে। তাই এসব পরজীবী দমনে বাছুরকে দু’মাস বয়স হলে কৃমিনাশক খাওয়ানো আরম্ভ করতে হবে।
বহিঃদেহের পরজীবীঃ এগুলোকে দেহের পোকা বলা হয়। বাছুরের ত্বকে বাস করে ত্বকের যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে। বহিঃদেহের পরজীবীর মধ্যে বাছুরে আঁঠালি, উকুন, মাছি, মাইটস বিশেষ উলে−খযোগ্য। বহিঃদেহের পরজীবী দমনে বাছুরের শরীর ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে। বাছুরের বয়স ৬ মাস হলে বহিঃদেহের পরজীবীধ্বংসকারী ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
৩। প্রোটোজোয়াজনিত রোগঃ প্রোটোজোয়া এক প্রকার এককোষী জীব বা আদ্যপ্রাণী। বাছুর বিভিন্ন ধরনের প্রোটোজোয়া
১। বেবেসিয়া, এনাপজমা, ককসিডিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে বাছুরে সাধারণতঃ ককসিডিয়া নামক প্রোটোজোয়ার আক্রমণ বেশী হতে দেখা যায়।
৪। সাধারণ রোগ-ব্যাধিঃ বাছুরের সাধারণতঃ রোগ-ব্যাধির মধ্যে রয়েছে বিষক্রিয়াজনিত রোগ, অপুষ্টিজনিত রোগ, পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ
১। পেট ফাঁপা
২। উদারাময়
৩।কোষ্ঠকাঠিণ্য
৪। বিপাকীয় রোগ।
বাছুরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ লাভজনক গবাদি প্রাণি পালনে রোগবালাই অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ সমস্যাকে কার্যকরী ভাবে প্রতিহত করতে হবে। যে সকল রোগের টিকা পাওয়া যায় সে সকল রোগের টিকা সঠিক সময়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া বাছুর বিভিন্ন কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে কেঁচো কৃমি বাছুরের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে থাকে। মায়ের রক্ত প্রবাহের সাথে গর্ভস্থ বাচ্চা এবং মায়ের দুধের মাধ্যমেও বাছুর এ কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়। বাছুর জন্মের পর পরই এক সপ্তাহ বয়সের মধ্যেই বাছুরের ওজন অনুপাতে সুবিধাজনক কোন কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে। হঠাৎ করে কোন কারণে বাচ্চা যেন অসুস্থ হয়ে না পড়ে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ।
১। গাভীর খাবারে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকা প্রয়োজন। এতে করে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
২। বাচ্চা জন্ম নেবার ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত বাচ্চাকে প্রচুর পরিমাণে গাভীর শালদুধ খাওয়াতে হবে। এতে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হবে।
৩। দূর্বল বাছুরকে প্রচুর দুধ খাওয়াতে হবে।
৪। বাছুরকে সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও শুকনো স্থানে রাখতে হবে।
৫। খাবারের পাত্র ও পানির পাত্র সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
৬। হঠাৎ বাছুরের যেন ঠান্ডা বা গরম না লাগে সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
৭। কয়েক দিন পর পর পরিষ্কার করে বিছানা বদল করে নতুন করে শুকনা খড় দিয়ে বিছানা করে দিতে হবে।
No comments
Please validate the capture