কি ভাবে বাছুর পালান করবেন
বাছুর পালান
বাছুর পালনকে সাধারনত পালের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ আজকের বাছুর আগামীদিনের ভবিষৎ। বাছুর লালন-পালন যদি যথাযথ না করা হয় তবে ভবিষ্যৎ উৎপাদন হ্রাস পাবে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গাভীর উৎপাদন ক্ষমতা বজায় থাকে। পর্যায়ক্রমে উন্নত জাত এবং উৎপাদনশীল গাভী দ্বারা কম উৎপাদনশীল গাভীকে অপসারনের মাধ্যমেই উচ্চ উৎপাদনশীল পাল গঠন করা সম্ভব। তাই বাছুর লালন-পালন অবশ্যই গুরুত্বপূণ
বাছুরের গর্ভকালীন যত্নঃ বাছুরের গর্ভকালীন যতœ বলতে প্রধানত মায়ের যতœই বুঝায়। এক্ষেত্রে গর্ভবতী গাভীকে অন্তত গর্ভের শেষ তিনমাস পর্যাপ্ত পুষ্টি সরবরাহ করতে হবে। দুধ দোহানো হলে ধীরে ধীরে শেষ তিন মাসে শুকিয়ে ফেলতে হবে। গাভীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখতে হবে। অন্য গরুর সাথে যেন মারামারি না করে তা খেয়াল রাখতে হবে। প্রসব নিকটবর্তী হলে মেটারনিটি পেন বা আলাদা স্থানে রাখতে হবে।
বাছুরের অন্যান্য যত্নঃ বাছুরের প্রতি সর্বদাই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সময় মত খাদ্য ও পানি সরবরাহ দিতে হবে। রোগ প্রতিরোধক টিকা দিতে হবে। বৃহত খামারে প্রতিটি বাছুরকে আলাদা করে চেনার জন্য প্রয়োজনীয় ট্যাগ নম্বর দিতে হবে। বাছুর বড় হওয়ার সাথে সাথে শিং কেটে ফেলাই ভাল। তা না হলে বিভিন্ন ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বাছুরের বাসস্থানঃ বাছুরের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান অত্যন্ত প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান বাছুরকে রোগমুক্ত রাখার প্রধান সহায়ক। বাছুরকে রোগমুক্ত রাখার জন্য তাদেরকে আলাদা আলাদা ঘরে রাখতে হবে এবং এর ফলে প্রতিটি বাছুরের রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে। অনেক বাছুর একসাথে থাকলে দূর্বল বাছুরগুলো আরও দূর্বল হয়ে পড়ে। কারন দূর্বলগুলো সবলদের সাথে প্রতিযোগীতা করে প্রয়োজন মত খেতে পারে না। বাছুরের ঘর ঢালু এবং শুকনো ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া উচিত । বাসস্থানে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের সরাসরি প্রবেশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড গরম ও শীতকালে প্রচন্ড ঠান্ডা দ্বারা বাছুরগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঘরের মেঝেতে শুকনো খড় বা ছালার চট বিছিয়ে দিতে হবে। গ্রামীণ পর্যায়ে বাঁশ ও কাঠের সাহায্যে অতি সহজেই ঘর নির্মাণ করা যেতে পারে। ঘরে খাদ্য ও পরিষ্কার পানি সরবরাহের জন্য পাত্র রাখতে হবে। বাছুরের ঘর সেঁতসেঁতে ময়লা আবর্জনাময় হলে বাছুরের শ্বাস কষ্ট হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য বাছুরকে তিন দলে ভাগ করা যায়।
ক। এক বছরের কম বয়সী।
খ। এক বছরের বেশী বয়সী বকনা বাছুর।
গ। এক বছরের বেশী বয়সী এঁড়ে বাছুর।
বাছুরকে তিন সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত পৃথকভাবে ও পরে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত ৪-৫ টির দল করে পৃথকভাবে লালন পালন করা উত্তম। এক বছরের কম বয়সী বাছুরের ঘর মায়ের কাছাকাছি ও মুক্তভাবে ঘোরা ফেরার জন্য ঘরের সাথে উন্মুক্ত স্থান থাকবে। বাছুরের ঘরে মাঝ বরাবর পথের দুপার্শ্বে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা ও উভয় পার্শ্বে মুক্তভাবে চলাফেরার জন্য উন্মুক্ত স্থান থাকবে।
বাছুরের খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ বাছুরের জন্মের পর থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত বাছুরকে যতটুকু পুষ্টিসাধন করা হবে পরবর্তী জীবনকালের বৃদ্ধি ও উৎপাদন তার উপর সিংহভাগ নির্ভর করবে। জন্মের প্রথম দিন থেকে সাধারণতঃ ৩ মাস বয়স পর্যন্ত বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধি ও ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় যদি শরীরে পুষ্টির অভাব হয় তবে এর যৌনাঙ্গের বিকাশ, যৌবন প্রাপ্তি দেরীতে আসবে যার ফলে গর্ভ ধারণ ও বাচ্চা উৎপাদন কম হবে। অনেক ক্ষেত্রে বাছুর পুষ্টির অভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে মারাও যেতে পারে। এসব কারণে জন্মের পর থেকেই পরিমিত খাদ্যসরবরাহের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা উচিত। কলোস্ট্রাম বা কাচলা বা শালদুধ বাচ্চা জন্মের প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে খাওয়ানো প্রয়োজন। এই দুধ বাছুরের জন্য অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্য। কেননা এই দুধে এমন কতগুলি উপাদান ও এন্টিবডি রয়েছে যা বাছুরকে বিভিন্ন রোগ বালাই হতে রক্ষা করে। অথচ গ্রামে অনেকেই গাভী প্রসবের পর এই শালদুধ বাছুরকে না খাওয়ায়ে পানিতে ফেলে দেয়। শালদুধ বাছুরকে একদিকে খাদ্য সরবরাহ করে অন্যদিকে বাছুরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শালদুধে প্রোটিনের ভাগ অত্যন্ত বেশী। এছাড়া এই দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ’ যা বাছুরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ শালদুধ বাছুরের রেচন কার্যের জন্য পরিপাক তন্ত্রকে পরিষ্কার করে এবং উপযুক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। জন্মের পর থেকে ৪-৬ মাস বয়স পর্যন্ত বাছুরকে দুধ খাওয়ানো উচিত। তবে ১ম মাসে ৩-৪ লিটারের বেশীন দুধ না খাওয়ানোই ভাল। এরপর দুধ না খাওয়ালেও বাছুরের সুষম বর্ধন এবং স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি হয় না। বাচ্চাকে গাভী থেকে দুধ চুষে খেতে দিতে হবে । এতে গাভী বেশী দুধ দিবে এবং গাভী দেরীতে দুগ্ধহীনা হবে। সাধারণতঃ বাছুরকে দুবেলা দুধ খেতে দিতে হবে এবং নিয়মিত একই সময়ে দুধ খাওয়াতে হবে। দেড় মাস বয়স পর্যন্ত শারীরিক ওজনের শতকরা ১০ ভাগ হারে দুধ খাওয়াতে হবে। দুই সপ্তাহ পর বাচ্চকে দুধ সরবরাহের সাথে সাথে অল্প পরিমাণ কচি ঘাস ও দানাদার খাদ্য খাওয়ানো উচিত। নতুবা এর হজম ক্ষমতা কমে যাবে এবং পাকস্থলির পরিপক্কপতা দেরীতে আসবে।
No comments
Please validate the capture