Header Ads

খামারের বর্জ্য হতে ডাকউইড উৎপাদন ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার

 খামারের বর্জ্য হতে ডাকউইড উৎপাদন ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার

ডাকউইড এক ধরনের ক্ষুদ্রাকৃতির ছোট ছোট জলজ উদ্ভিদ যা বদ্ধ স্রোতহীন জলাশয়ের উপর দলবদ্ধ ভাবে ভেসে থাকে। ডাকউইডকে ভ্রমবশত অনেকে ” শেওলা” মনে করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষেএরা সপুস্পক উদ্ভিদ অর্থাৎ এদের ফুল হয়। সপুস্পক উদ্ভিদ হলেও প্রকৃতিতে ডাকউইড প্রধানত ”কুড়ি” উৎপাদনের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে এবং এত দ্রুত বিভাজন হয় যে, আদর্শ পরিবেশে ৮-১৬ ঘন্টার মধ্যে এক কেজি ডাকউইড দুই কেজিতে পরিণত হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ডাকউইডের পুষ্টিমানও যথেষ্ট। ডাকউইডে ৪০% পর্যন্ত আমিষ থাকতে পারে । মানবদেহের ও প্রাণিপাখির জন্য আবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড গুলোর অধিকাংশ ডাকউইডেআছে। এছাড়া ডাকউইডে পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন ”এ” ও ”ডি” বিদ্যমান। এজন্য ডাকউইডকে মাছ ও প্রাণি-পাখির খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়।


পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত বিবরণীঃ  গবাদিপ্রাণি ও হাঁস-মুরগী ইত্যাদির খাদ্যে সরবরাহকৃত পুষ্টির ৫০-৬০% মল ও মূত্র হিসাবে বেরিয়ে আসে যা বর্তমানে আংশিক বা পরিপূর্ণ ভাবে নষ্ট বা অপচয় হয়। অথচ এই মুল্যবান পুষ্টি উপাদান সমূহকে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাণিপাখীর পুষ্টি চাহিদা বহুলাংশে পূরণ সম্ভব। খামারে উৎপাদিত বিভিন্ন বর্জ্যরে মধ্যে গোবর, মুরগীর বিষ্ঠা ও গোয়াল ধোয়া পানি অন্যতম। এই গোবর বা বিষ্ঠাকে আবার অবায়বীয় ফার্মেন্টেশন করেও ব্যবহার করা যেতে পারে। সারণী ১৭.১০ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যরে গড় পুষ্টিমান দেয়া হল। 


ছোট আকারের কৃত্রিম পুকুরে ডাকউইড চাষ

পলিথিনের কৃত্রিম পুকুরঃ এ ধরনের পুকুর সমতল জায়গায় মাটি বা ইটের দেওয়ালের তৈরী হতে পারে। যা ৮ মিটার লম্বা, ২ মিটার প্রশস্ত এবং ০.৫ মিটার গভীর হতে পারে। এভাবে তৈরী আয়তকার দেয়ালের উপর পলিথিন বিছিয়ে কৃত্রিম পুকুর তৈরী করা হয়। পুকুরে ৩০ - ৩৫ সেঃ মিঃ (প্রায় ১ ফুট) পর্যন্ত পানি দিয়ে ডাকউইড উৎপাদন করা হয়। ১৬ বর্গ মিটার আয়তন এবং ০.৩৫ মিটার গভীরতা বিশিষ্ট পুকুরে প্রায় ৫৬০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়।

ডাকউইড উৎপাদনে বিভিন্ন খামার বর্জ্যরে মাত্রাঃ  সারণী ১৭.১০ এ দেখা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন ধরনের খামার বর্জ্যরে পুষ্টিমান, বিশেষত, মোট নাইট্রোজেন ও এমোনিয়া-নাইট্রোজেনের পরিমাণ ভিন্ন। ফলে ডাকউইড উৎপাদনে এদের ব্যবহার মাত্রাও ভিন্ন। সারণী ১৭.১১ এ ১৬ বর্গ মিটার আয়তন ও ০.৩৫ মিটার পানির গভীরতা সস্পন্ন কৃত্রিম পলিথিনের পুকুরে ডাকউইড উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের খামার বর্জ্য কি পরিমাণ ব্যবহার করা হবে তা দেয়া হল।

বর্জ্যরে প্রয়োগঃ ডাকউইড পুকুরে পুষ্টির উপাদান একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখার জন্য প্রথমে বেশী পরিমানে (সারণী ১৭.১১ দেখুন) বর্জ্য উপাদান দিতে হয়। যেহেতু ডাকউইড বৃদ্ধির সাথে সাথে পানিতে দ্রবীভূত পুষ্টির পরিমান কমতে থাকে, এ অবস্থায় ডাকউইডের উৎপাদন আশানুরূপ রাখার জন্য প্রতিদিন সারণী ১৭.১১ অনুসারে বর্জ্য দিতে হবে।

ডাকউইড চাষের বীজের মাত্রাঃ  বিভিন্ন ধরনের ডাকউইড চাষে ভিন্ন মাত্রার বীজ দিতে হয়। যেমনঃ লেমনা, উলফিয়া ও স্পাইরোডেলার বীজের মাত্রা যথাক্রমে প্রতি বর্গ মিটারে ৪০০, ৫০০ এবং ৬০০ গ্রাম।

দৈনন্দিন পরিচর্যা

১. পুকুরের ডাকউইড প্রতিদিন অন্তত একবার নেড়ে দিতে হয় যা ডাকউইডের মূল এবং পাতার ময়লা দূর করে এর পুষ্টি সংগ্রহ সহজ করে। তাজা গোবর এবং মুরগীর বিষ্ঠা পুকুরের তলদেশে অবায়বীয় ফার্মেন্টেশনের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন উৎপাদন করে যা বর্জ্যসহ সরের মত পুকুরের উপর ভেসে উঠে ফলে ডাকউইডের পুষ্টি শোষণে ব্যঘাত ঘটে। এই সরকে ভেঙ্গে না দিলে ডাকউইড পুষ্টির অভাবে মারাযেতে পারে। তাছাড়া নাড়া চাড়া ডাকউইডের অঙ্গজ প্রজননেও সহায়তা করে।

২. স্পাইরোডেলা বিভিন্ন ধরনের পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিঃ লিঃ মেলাথিয়ন ব্যবহার করতে হবে। তবে লেমনাও উলফিয়াতে এ ধরনের কোন সমস্যা সাধারনত দেখা যায় না।

৩. জৈব বর্জ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দীর্ঘ দিন ধরে একটি পুকুরে নির্ধারিত পরিমাণ বর্জ্য ব্যবহার করা সত্তে¡ও ৩০-৩৫ দিন পর ডাকউইড উৎপাদন কমতে থাকে। এক্ষেত্রে প্রতি এক মাস পর পর পানি পরিবর্তন করে নতুন ভাবে ডাকউইড উৎপাদন শুরু করতে হবে। ডাকউইডের সংগ্রহঃ প্রতি বর্গ মিটারে ৮০-১০০ গ্রাম হিসাবে ১৬ বর্গ মিটার পুকুর থেকে দৈনিক ১.২৮-১.৩২ কেজি ডাকউইড সংগ্রহ করা যায়। গোবর/বিষ্ঠা ব্যবহারে কৃত্রিম পুকুরে ডাকউইডের ফলনঃ খামার বর্জ্য থেকে উৎপাদিত ডাকউইডের মধ্যে কাঁচা অবস্থায় উৎপাদন সবচেয়ে বেশী উলফিয়া প্রজাতির ( ১৭৫০ কেজি/ হেঃ/দিন)এর পর লেমনা(৮২০ কেজি/হেঃ/দিন) ও স্পাইরোডেলার (৭২০ কেজি/হেঃ/দিন)। কিন্তু শুষ্ক পদার্থের ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশী উৎপাদন লেমনাতে এরপর উলফিয়া ও স্পাইরোডেলার। সারণী ১৭.১২এ বিভিন্ন বর্জ্য থেকে উৎপাদিত স্পাইরোডেলার পুষ্টিমান দেয়া হল। 


হদাকার গবাদি প্রাণির খামারে ডাকউইড উৎপাদনঃ একশত পঞ্চাশ থেকে দুইশত গরু বিশিষ্ট গবাদি প্রাণির খামারে দৈনিক প্রায় ১৫০০০-২০০০০ লিটার পানি গোয়াল ধোয়া, খাওয়ানো এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। এই পানিতে মলমূত্র মিশে বিভিন্ন জৈব পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ হয় যা ডাকউইডের পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। এক্ষেত্রে গোয়ালধোয়া পানি প্রথমে একটি পুকুরে জমিয়ে মিনারালাইজড করা হয়। পরবর্তীতে সেই পানিতেই ডাকউইড উৎপাদন করা হয়। এ ধরনের বর্জ্য থেকে উৎপাদিত ডাকউইডের(লেমনার) ফলন ও গুনগত মান সারণী ১৭.১৩ এ দেয়া হলো। 


 গবাদি প্রাণির খামারে ডাকউইড উৎপাদনঃ  একশত পঞ্চাশ থেকে দুইশত গরু বিশিষ্ট গবাদি প্রাণির খামারে দৈনিক প্রায় ১৫০০০-২০০০০ লিটার পানি গোয়াল ধোয়া, খাওয়ানো এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। এই পানিতে মলমূত্র মিশে বিভিন্ন জৈব পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ হয় যা ডাকউইডের পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। এক্ষেত্রে গোয়ালধোয়া পানি প্রথমে একটি পুকুরে জমিয়ে মিনারালাইজড করা হয়। পরবর্তীতে সেই পানিতেই ডাকউইড উৎপাদন করা হয়। এ ধরনের বর্জ্য থেকে উৎপাদিত ডাকউইডের(লেমনার) ফলন ও গুনগত মান সারণী ১৭.১৩ এ দেয়া হলো। 


প্রাণিখাদ্য হিসাবে ডাকউইডের ব্যবহারঃ সবুজ ঘাসের বিকল্প হিসাবে গরুর খাদ্যে ডাকউইড ব্যবহার করা যায়। একটি গরু দৈনিক ১০-১২ কেজি কাঁচা ডাকউইড খেতে পারে। এক্ষেত্রে কুড়া বা ভূষির সাথে প্রতি কেজি ডাকউইডের ১০০ গ্রাম পরিমান মোলাসেস মিশাতে হয়। এতে গরুর মাংস ও দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। খামারে উৎপাদিত বর্জ্য ব্যবহারে ডাকউইডের উৎপাদন এবং প্রাণিখাদ্য হিসাবে এর ব্যবহার খাদ্য খরচ বহুলাংশে কমিয়ে দিতে পারে।





No comments

Please validate the capture

Powered by Blogger.